শত্রু কাটাকুটি দিয়ে নৃসংসভাবে যেভাবে আমার প্রতি বছর শুরু হয়... || Ankon Dey Animesh
শত্রুকাটা ব্যাপারটা কি শুধু আমার ঘরে হয় নাকি বাঙালি অনেক ঘরেই হয়, আমি তা ঠিক জানি না। তবে ১৪ এপ্রিল আসলেই সকালে উঠেই আমি মা কে প্রথম যেটা জিজ্ঞেস করি, সেটা হচ্ছে শত্রু কবে কাটব?
এত নৃসংসভাবে বছর শুরু করি বলে মনে হচ্ছে আমরা খুব হিংস্র? একদম তার উলটো। আমরা শত্রু হিসেবে কাটি কচুর ডগা। বিন্দুমাত্র রক্তপাত হওয়া দূরের কথা, পানি পাত ও হয় না। প্রথমে খই এর ছোট ছোট গুড়ো বা ছাতু ছড়িয়ে দিই মাটিতে, এরপর সেখানে আমরা সবাই দা ভিঞ্চি হয়ে যাই, নিজেদের শত্রুর ছবি আঁকি। নাহ দা ভিঞ্চি ঠিক নয়, বরং পাবলো পিকাসো। ২/৩ বছরের বাচ্চাও সম্ভবত এর থেকে ভালো মানুষ আঁকে। জীবনে তেমন কোনো শত্রু না থাকায় কারো চেহারা কল্পনা করে আঁকি না, তাই যে মানুষের ছবি আঁকি সেটা মানুষ নাকি দু পেয়ে এলিয়েন, সেটা একটা ডিবেটেবল ব্যাপার। এরপর আমরা একে একে শত্রুর হাত, পা, বুক, গলা, এবং শেষে মাথা কাটি সেই ছবিতে। এবং সাথে একটা কচুর ডগাকে কাটতে থাকি।
সব থেকে কষ্ট তখন লাগে যখন বোনদেরকে জিজ্ঞেস করি কাকে কাটলি আর ওরা উত্তর দেয় "তোমাকে, অবশ্যই!"
শত্রু কাটা ব্যাপারটাতে ৩ জন দরকার পড়ে।। প্রথম জনের কাজ কমেন্ট্রি করা, বিপিএল এর কমেন্ট্রি থেকেও খারাপ কমেন্ট্রি। ওরা শুধু একটা লাইনই বলে "শত্রুর কী কাটসো?" এরপরের জন কাটে। সে বলে "শত্রুর পা কাটলাম।" এবং অপরজন পাবলো পিকাসোর আত্মার আঁকা মানুষের ছবি। সে বেচারা কিছু বলে না। ছুরিকাঘাতে তার প্রতিরূপ ক্ষত বিক্ষত হয়। এমনকি কাটাকাটি শেষ হলে কেউ কেউ তাকে পায়ের নিচে গুড়িয়ে দেয়। মোটামুটি সবথেকে বিধ্বস্ত থাকে সে। ছবি দেখাতে পারলে ভালো হত, কারণ এই ফেসবুকের যুগে কেউ আর টেক্সট পড়ে কিছু বুঝে না, ছবি দেখতে হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি স্মার্টফোন ইউজ করি না।
শত্রু কাটা ব্যাপারটা সুন্দর, নৃসংস একটা ব্যাপারকে একটা কচু কাটার মধ্যে সীমিত করে ফেলা অবশ্যই সুন্দর। কিন্তু এটার নিয়মগুলো খুব ই বিদ্ঘুটে। যেমন শত্রু কাটার আগে হলুদ দিয়ে স্নান করতে হয়। হলুদ হচ্ছে শুদ্ধতার প্রতীক, শুদ্ধ শুভ্র চিন্তার প্রতীক, পবিত্রতার রঙ (হুমায়ুন আহমেদ এর মতে গু এর রঙ যদিও) । এই শুভ্র চিন্তার উদ্রেক এর পরে শত্রু কাটার মত একটা হিংস্র চিন্তার আনয়ন ঘটানোর কী ই বা দরকার। বছর শেষে শত্রু কাটলে আগে কেটে এরপর স্নান করে পবিত্র হয়ে নাও? নাহ সেটা হবে না। স্নান করতে হবে।
আর যারা শত্রু কাটে, এরা এক পিকিউলিয়ার জীব। মানে জীবনে তো খুন করবেই না, হয়ত টিভিতেও খুন করা ঠিক মত দেখে নাই। অদ্ভুত ভাবে শত্রু কাটে। আবার কিছু আছে নিজেকে সিরিয়াল কিলার ভাবে। অনেক ভাব নিয়ে ঠান্ডা চোখে খুন করে। তবে সব থেকে সুন্দর করে শত্রু কাটে আমার মা। কচুর সেই আগাকে শুণ্যে ধরে রেখে ছুরি দিয়ে ছপাস করে এমন এক নিখুঁত কোপ দেয় যে আগা ৪৫ ডিগ্রী কোণে কেটে যায়, আর বাকি ছিলাটা বিল্ডীং এর বাইরে গিয়ে পড়ে। এরকমভাবে শত্রু কাটা আয়ত্ত করার জন্য নির্ঘাত প্র্যাক্টিস এর দরকার!
শত্রু কাটার সময় আমি বিপাকে পড়ে যাই। জগৎজুড়ে কাউকে শত্রু প্রতিপন্ন তো হয়না! বন্ধু মনে হয় সকলকেই। কাকে কাটি? (ভাগ্যিস আসলেই শত্রুদের মৃত্যু হয়না, নাইলে আমার ছোটবেলায় যে পরিমাণ রাগ ছিল, অনেক আঙ্কেল আন্টিকেও শত্রু ভেবে কেটে দেওয়া স্বাভাবিক) ভেবে চিনতে ঠিক করলাম, অন্য যারা আমাকে শত্রু ভাবে, সবাইকে কাটি। এটাতেও একটা সমস্যা বিদ্যমান। মাঝে মাঝেই ঘরে শুনতে হয় না যে "অমুক কে দেখ। কত কিছু করে। কত পড়ে। হ ওর মত। পারলে ওর পা ধোঁয়া পানি খাইস।" সমস্যা হচ্ছে আমার কাজিন সার্কেলে সবাই বাবা মা থেকে মাইর খায় আমার জন্য। আমার পা ধোঁয়া পানিই সবার চাওয়া। বেতের বাড়ি খাওয়ার আগে আমার নাম শুনে। আশা করি তারা শত্রু হিসেবে আমাকে কাটে না (আশা করা অন্যায়)।
ওহ, পাবলো পিকাসোর মত ছবি আঁকার জন্য ছাদে যাওয়া লাগে। পিনিক না হলে জমে না। মূলত, মা আর ঠাম্মার থেকে শোনা নিয়ম আর কি। খোলা আকাশের নিচে এসব হিংস্রতা করতে হয়। নাহলে শত্রু ঘরে এসে ঘরে লুকিয়ে পড়ে, আটকে যায়। কাটাকাটি, শত্রু- এসব কথা বেশি লিখলাম, গুগল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি আমার লেখাকে ভায়োলেন্ট ধরে নিয়ে ব্যান করে দিবে আমাকে?

Comments
Post a Comment